মূল সংবাদে যান
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

প্লাস্টিকের দাপটে বিলুপ্তির পথে কেশবপুরের মৃৎশিল্প

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
প্লাস্টিকের দাপটে বিলুপ্তির পথে কেশবপুরের মৃৎশিল্প

বাবা, আমাকে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল আর মাটির গাড়ি কিনে দাও! দাদি বলেছে তুমি ছোটবেলায় এগুলো দিয়ে খেলাধুলা করতে। আমিও খেলব! সকালে ঘুম থেকে উঠতেই ছেলে ইনজামাম আহমেদ আয়ানের এমন এক আবদার থমকে দিল মনটাকে। চোখের সামনে ভেসে উঠল শৈশবের সেই রঙিন দিনগুলো যেখানে খেলাধুলার প্রধান অনুষঙ্গই ছিল মাটির তৈরি ছোট ছোট হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল ও নানা জাতের পশুপাখির প্রতিকৃতি।

লাল, সবুজ আর হলুদ রঙে সাজানো এসব মৃৎসামগ্রী গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি গ্রামীণ মেলা ও উৎসবে তৈরি করত এক অনাবিল আনন্দ।

কিন্তু আজ সময় বদলেছে। আধুনিকতার পরশ আর প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দাপটে যশোরের কেশবপুরে ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গ্রামবাংলার হাজার বছরের এই লোকজ ঐতিহ্য।

ছেলের এই পুতুল খেলার দাবি মেটাতে গিয়ে বাস্তবতার নির্মম চিত্র চোখে পড়ল। কেশবপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে কোথাও মাটির খেলনার সন্ধান মিলছিল না। প্রায় দুই ঘণ্টার আকুল অনুসন্ধানের পর অবশেষে কেশবপুর সরকারি পাইলট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে দেখা মিলল ঐতিহ্যবাহী এই মাটির পণ্যের।

ছোট্ট একটি দোকানে থরে থরে সাজানো হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, মগ, ফুলদানি, টব, বিশেষ পানির জগসহ প্রায় শতাধিক পদের মাটির সামগ্রী। ১০ টাকা দামের মাটির ব্যাংক থেকে শুরু করে ২৫০ টাকা দামের বিশেষ পানির জগ এবং গৃহস্থালির ‘ঝিলে সরা’সবই রয়েছে সেখানে। কিন্তু দোকানগুলোতে নেই ক্রেতার কোলাহল।

কেশবপুর সরকারি পাইলট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে দীর্ঘ দিন ধরে মাটির পণ্য বিক্রি করছেন সুভাষ চন্দ্র পাল। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন,সকাল থেকে বসে মাত্র ১০০ টাকার পণ্য বিক্রি করেছি। বর্তমানে প্লাস্টিকের সামগ্রী তুলনামূলক সস্তা ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় মানুষ আর মাটির পাত্র কেনে না। ফলে আমাদের ব্যবসায় ধস নেমেছে।

আরেক প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ী ৮০ বছর বয়সী ব্রু দাস পাল নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তুলে ধরলেন বর্তমান সংকটের মূল কারণ। তিনি জানান, বর্তমানে মাটির পণ্যের একটি বড় অংশ যশোরের দায়তলা থেকে পাইকারি দরে সংগ্রহ করা হয় এবং সামান্য কিছু স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়। কিন্তু এলাকায় ইটভাটার আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় মাটির পণ্য তৈরির উপযোগী দোআঁশ ও এঁটেল মাটি আর সহজে পাওয়া যায় না। দূরবর্তী এলাকা থেকে বেশি দামে মাটি কিনে এনে পণ্য তৈরি করায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে উৎপাদন খরচ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেশবপুর উপজেলার আলতাপোল পালপাড়া, ব্রহ্মকাটি ও ঐতিহ্যবাহী বুড়িহাটী গ্রামের হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এখনও বংশপরম্পরায় এ পেশা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে কাঁচামালের চড়া দাম, সরকারি-বেসরকারি প্রণোদনা বা সহজ শর্তে ঋণের অভাব এবং বাজারে বিক্রি কমে যাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। ফলে নতুন ও তরুণ প্রজন্ম আর এ পেশায় আসতে চাইছে না; বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিচ্ছে পৈতৃক ব্যবসা।

কেশবপুর ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের কথায় ফুটে উঠেছে নতুন প্রজন্মের মনোভাব। তিনি বলেন,আমরা ছোটবেলা থেকেই প্লাস্টিকের পণ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। সত্যি বলতে, মাটির তৈরি জিনিসপত্রের স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত সুবিধা নিয়ে আমাদের প্রজন্মে তেমন আলোচনা বা সচেতনতা নেই।

পরিবেশবিদদের মতে, মাটির পণ্য কেবল ঐতিহ্যের স্মারক নয়, এটি শতভাগ পরিবেশবান্ধবও বটে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখা জরুরি। প্রথাগত তৈজসপত্রের পাশাপাশি আধুনিক গৃহসজ্জা (ইন্টেরিওর ডেকোরেশন), শোপিস এবং ই-কমার্সভিত্তিক অনলাইন বাজারজাতকরণে তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে এ শিল্পের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া এই লোকশিল্পকে বাঁচাতে মৃৎশিল্পীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা, কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন কেশবপুরের স্থানীয় কারিগর ও সুশীল সমাজ।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
আগের সংবাদ

নলডাঙ্গায় নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সেমিনার

পরের সংবাদ

নরসিংদীতে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক উদ্ধার

আরও পড়ুন

বিভাগভিত্তিক আরও সংবাদ

বিভিন্ন বিভাগের সাম্প্রতিক ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এক জায়গায় পড়ুন।

স্বাস্থ্য

সব সংবাদ