রাজধানীর তাঁতীবাজারের ব্যস্ত সড়ক। যানজটে ধীরগতিতে চলছে নীল রঙের একটি প্রিজন ভ্যান। ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকাল ৫টা ৫৮ মিনিট। একপর্যায়ে খুলে দেওয়া হয় ভ্যানটির পেছনের দরজা। সেখান থেকে মাস্ক পরা তিন ব্যক্তি একে একে সড়কে নামেন।
তাদের মধ্যে একজন মোহাম্মদপুরের আলোচিত মাদক কারবারি রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা। আরেকজন আসামি খাইরুল বাশার, অন্যজন পুলিশ কর্মকর্তা।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, প্রিজন ভ্যান থেকে বের হওয়ার পর পিচ্চি রাজা সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তার পেছনে হাঁটছেন ভ্যানটির দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) প্রবীর কুমার বিশ্বাস।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পাওয়া কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশের সহায়তায় পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
যেভাবে ভ্যান থেকে বের হন
২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে হাজিরা শেষে ৩০ আসামিকে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশে রওয়ানা হয় প্রিজন ভ্যানটি। তাঁতীবাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে পৌঁছালে যানজটে ভ্যানটির গতি কমে আসে।
পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, ওই সময় প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস চালকের কাছ থেকে চাবি নিয়ে পেছনের দরজা খুলে দেন। এরপর তিনি ভেতরে ঢুকে পিচ্চি রাজা ও আরেক আসামি খাইরুল বাশারকে বাইরে নিয়ে আসেন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পিচ্চি রাজার সঙ্গে সাদা জামা পরা খাইরুল বাশারও ভ্যান থেকে নেমে সড়কে হাঁটতে শুরু করেন। কিছু দূর যাওয়ার পর খাইরুল আবার প্রিজন ভ্যানে ফিরে যান। তাকে চালকের পাশের আসনে গিয়ে বসতে দেখা যায়।
তবে পিচ্চি রাজা আর ভ্যানে ওঠেননি। তিনি সামনের দিকে হাঁটতে থাকেন। তার পেছন পেছন হাঁটেন লাল জামা পরা এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস।
এরপর ওঠেন প্রাইভেট কারে
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার জানিয়েছেন, প্রিজন ভ্যান থেকে বের হওয়ার পর পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস একটি প্রাইভেট কারে ওঠেন। ওই দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজে ধরা না পড়লেও তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে ঠিক ৬টার দিকে পিচ্চি রাজা ও এসআই প্রবীরকে ছাড়াই প্রিজন ভ্যানটি তাঁতীবাজার থেকে চলে যায়। অর্থাৎ ভ্যান থেকে নামার মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ৩০ মামলার আসামি পিচ্চি রাজা পুলিশের হেফাজত থেকে বেরিয়ে যান।
পুলিশের ভাষ্য, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতেই পিচ্চি রাজাকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো হয়েছিল। আর প্রিজন ভ্যানে এসি থাকায় আরামে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলে খাইরুল বাশারকে চালকের পাশে বসানো হয়।
দুদিন আগেই হয়েছিল পরিকল্পনা
পুলিশ জানিয়েছে, পিচ্চি রাজাকে পালিয়ে যেতে সহায়তার পরিকল্পনা ঘটনার দুই দিন আগেই করা হয়েছিল। এতে প্রিজন ভ্যানটির চালক নায়েক কামাল হোসেন ও পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমার সম্পৃক্ততা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, তাঁতীবাজারে পিচ্চি রাজাকে প্রিজন ভ্যান থেকে বের করে একটি অপেক্ষমাণ প্রাইভেট কারে তুলে দেওয়ার পর ঘটনাটি আড়াল করতে পরে ভিন্ন একটি গল্প সাজানো হয়। শুরুতে পুলিশ জানিয়েছিল, গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় শৌচকর্মের কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে পিচ্চি রাজা পালিয়ে যান। পরে তদন্তে সেই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার মিল পাওয়া যায়নি।
গ্রেফতার তিনজন
এ ঘটনায় এসআই প্রবীর কুমার বিশ্বাস, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন ও পিচ্চি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার গাজীপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক জুবায়ের রশিদ তাদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
জিএমপি কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার জানিয়েছেন, এ ঘটনায় আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির চালক ও পিচ্চি রাজার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ও রয়েছেন।
কোথায় গেলেন পিচ্চি রাজা
তবে সিসিটিভি ফুটেজে প্রিজন ভ্যান থেকে বের হওয়ার পর পিচ্চি রাজা যে প্রাইভেট কারে ওঠেন, সেটি কোথায় গেছে এবং এরপর তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি পুলিশ।
তাকে গ্রেফতারে দেশের বিভিন্ন সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই সঙ্গে তার সহযোগীদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
এর আগে গত ১৯ মে সন্ধ্যায় নেপাল থেকে দেশে ফেরার পথে স্ত্রী ও শ্যালকসহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হয়ে তিনি কারাগারে ছিলেন।