গত পাঁচ দশকে যমুনা, গঙ্গা আর এদের মিলনে তৈরি পদ্মা নদী মিলে দেশের প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ বর্গকিলোমিটার জমি ভেঙে নিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই জমি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট আয়তনের চেয়েও পাঁচ গুণের বেশি।
তবে এর মধ্যে প্রায় ৪৩৩ বর্গকিলোমিটার জমি আবার জেগে উঠেছে নতুন নতুন চর হিসেবে। নদীর গতিপথ বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব বালুচর তৈরি হয়, আবার ডুবেও যায়।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পেয়েছে।
সব মিলিয়ে নদীভাঙনে দেশের প্রায় ১ হাজার ১৫৩ বর্গকিলোমিটার জমি স্থায়ীভাবে হারিয়েছে। এই আয়তন পুরো ঢাকা শহরের প্রায় চার গুণ।
নদী যখন ঘরবাড়ি আর ফসলের জমি গিলে নেয়, তখন মানুষের বারবার ঠিকানা বদলাতে হয়। নতুন করে জেগে ওঠা চরগুলোও তাদের জন্য স্থায়ী আশ্রয় হয়ে ওঠে না। শেষমেশ উপায় না পেয়ে অনেকেই গ্রামের মায়া কাটিয়ে শহরের পথ ধরেন।
পড়াশোনা বা কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় ঢাকায় এসে তারা অনিয়মিত পেশা বেছে নেন। কেউ দিনমজুর হন, কেউ গৃহকর্মী, আবার কেউ রিকশা চালান।
তারা সাধারণত শহরের নিচু ও বন্যাপ্রবণ এলাকার বস্তিতে গিয়ে ওঠেন। এসব বস্তিতে এর আগেও নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারা মানুষেরা এসে বসতি গড়েছেন।
ঢাকার পল্লবীর ভোলার বস্তি এখন ৩০ হাজারের বেশি মানুষের বাসস্থান। তাদের বেশির ভাগই ভোলা জেলার নদীভাঙন ও বন্যায় সর্বস্ব হারিয়ে এখানে এসেছেন।
অভিবাসন নিয়ে গবেষণা করা ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকার উত্তর-পশ্চিম অংশের এলাকাগুলোতে নদীভাঙা মানুষের বসতি বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে মিরপুর-১২, মোল্লা বস্তি ও দুয়ারীপাড়া।
নদীর তীর থেকে ভেসে আসা মানুষেরা সরাসরি শহরের এসব বস্তিতে এসে আশ্রয় নেন। ফলে শহরের কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় দারিদ্র্য আরও ঘন হয়ে উঠছে।
নদীভাঙনে বাংলাদেশে ঠিক কত মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই।
সিইজিআইএসের নদী, বদ্বীপ ও উপকূলের ভূমিরূপ বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ সুদীপ্ত কুমার হোড় বলেন, তাদের হিসাবে প্রতি এক বর্গকিলোমিটার নদীভাঙনে প্রায় ১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি সাতজন মানুষের একজন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারেন।
এর মধ্যে নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার হার হতে পারে মোট বাস্তুচ্যুতির প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।