চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে ৯১০ জন নারী কর্মী যুক্ত হয়েছেন। তবে কর্মী বাড়লেও নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা উল্টো কমেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘জেন্ডার ইকুয়ালিটি রিপোর্ট অব ব্যাংকস অ্যান্ড এফআইস’ শীর্ষক প্রতিবেদন ও এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারীবান্ধব সূচকগুলোতে ব্যাংকগুলো পিছিয়েছে।
গত ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৩৮টি ব্যাংকে ডে-কেয়ার বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকলেও ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন প্রান্তিকে তা কমে ৩৭টিতে দাঁড়িয়েছে। অফিস সময়ের পর নারী কর্মীদের জন্য নিজস্ব পরিবহন সুবিধা দেওয়া ব্যাংকের সংখ্যা ৩৮টি থেকে কমে ৩৬টিতে নেমেছে।
একইভাবে, জেন্ডার সমতা বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া ব্যাংকের সংখ্যা ৫৩টি থেকে কমে ৪৯টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, দেশের ৬১টি ব্যাংকের সব কটিতেই যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতি এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) ক্ষেত্রেও সুযোগ-সুবিধা কমার একই চিত্র দেখা গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সুবিধা ৬টি থেকে কমে ৪টিতে, অফিস শেষে পরিবহন সুবিধা ২৪টি থেকে কমে ২৩টিতে এবং লিঙ্গ সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ২৩টি থেকে কমে ২১টি প্রতিষ্ঠানে নেমে এসেছে।
সিপিডির ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, নারী কর্মসংস্থান বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক বিষয়। তবে কর্মক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা কমে যাওয়া প্রমাণ করে যে এই অগ্রগতি প্রাতিষ্ঠানিক না হয়ে মূলত সংখ্যাগত দিক দিয়ে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘নারীদের নিয়োগ, ধরে রাখা এবং পেশাগত অগ্রগতি—বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ে যাওয়ার জন্য ডে-কেয়ার সুবিধা, অফিস শেষে নিরাপদ পরিবহন এবং জেন্ডার সচেতনতাবিষয়ক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।
এসব জায়গায় অবনতি হলে নারী কর্মীদের ওপর কাজ ও পরিবারের চাপ বাড়বে, নিরাপত্তার উদ্বেগ তৈরি হবে এবং চাকরি ছাড়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।’
কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে শুধু বেশি নারী নিয়োগ দেওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং তাদের জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর উচিত এসব সুবিধাকে ঐচ্ছিক মনে না করে মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া এবং তা নিয়মিত তদারকি করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে ব্যাংকিং খাতে মোট জনবল ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ২ লাখ ১৭ হাজার ৮১৮ জনে দাঁড়ালেও নারী কর্মীদের অনুপাত সাড়ে ১৬ শতাংশের আশপাশেই আটকে আছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে মোট কর্মীর এক-চতুর্থাংশ নারী।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে এই হার ১৭ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে তা ১৬ শতাংশের সামান্য বেশি।
ব্যাংকগুলোতে জ্যেষ্ঠ বা শীর্ষ নেতৃত্বে নারীদের পিছিয়ে থাকার বিষয়টিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারী কর্মীর হার ১৭ শতাংশ এবং মধ্যম পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ হলেও উচ্চপদে এই হার মাত্র ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
তবে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে নারীদের অংশগ্রহণ গড়ে ১৩ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পর্ষদে নারীদের হার সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে তা সর্বনিম্ন ৪ শতাংশ।