দেবদাস বলিল, “মদ খাই কেন জানিস? শুধু তোকে ভুলে থাকার জন্য।” চুনিলাল হাসিয়া বলিল, “কিন্তু মদ খাইলে কি মানুষকে ভোলা যায়?” দেবদাস দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “না, ভোলা যায় না।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘দেবদাস’র এই অনবদ্য সংলাপটি কেবল কোনো সাহিত্যিক চরিত্রের আত্মযন্ত্রণা নয়; এটি শতাব্দীজুড়ে নেশার মরণফাঁদে পা দেওয়া কোটি কোটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সত্য।
মানুষ সাময়িক বিষাদ কিংবা কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে নেশার জগতে প্রবেশ করে, কিন্তু কালক্রমে সেই নেশাই তার পরম শত্রুতে পরিণত হয়ে জীবনের শেষ আলোটুকুও নিভিয়ে দেয়। বাংলা সাহিত্যের দেবদাস থেকে শুরু করে বিশ্বসাহিত্যের অসংখ্য চরিত্রে মাদকের আত্মবিনাশী রূপ আমরা দেখেছি।
কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে এই ভয়াবহতা আর সাহিত্যের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই তা রূপ নিয়েছে এক প্রাণঘাতী সামাজিক মহামারিতে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক সুবিধা পেতে হলে তরুণদের স্বাস্থ্যবান, দক্ষ ও মানসিকভাবে দৃঢ় হওয়া অপরিহার্য।
কিন্তু আজ বাংলাদেশে এক বিরাট অংশের তরুণ ও কিশোর মাদকাসক্তির কবলে পড়ে ধ্বংসের মুখে ধাবিত হচ্ছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং আধুনিক যুগের ভয়াল কেমিক্যাল মাদক যেমন এলএসডি ও ক্যাটামিন তরুণদের মস্তিষ্ক ও কর্মক্ষমতা পুরোপুরি পঙ্গু করে দিচ্ছে।
পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ জাতীয় গবেষণায় বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতির এক আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে; যেখানে দেখা যায় বর্তমানে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ (মোট জনসংখ্যার ৪.৮৮%) অবৈধ মাদকে আসক্ত, যার মধ্যে এককভাবে ঢাকায় ২২.৯ লাখ এবং চট্টগ্রামে ১৮.৮ লাখ সেবী আছে।
তবে শতকরা হারের দিক থেকে ময়মনসিংহ (৬.০২%) ও রংপুর (৬%) সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে। সর্বনাশা এই বিষের শীর্ষে রয়েছে গাঁজা (৬১ লাখ) ও ইয়াবা (২৩ লাখ), আর সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো দেশের প্রায় ৯২% আসক্তই তাদের শৈশব কিংবা উদীয়মান তরুণ বয়সে (৩৩% মাত্র ৮-১৭ বছরে এবং ৫৯% ১৮-২৫ বছর বয়সে) প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করে।
৯০% ব্যবহারকারী মাদকের অতি-সহজলভ্যতাকে আসক্তির প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করলেও এবং প্রায় অর্ধেক আসক্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইলেও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে মাত্র ১৩% মানুষ সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা পাচ্ছেন।
মাদক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তাকে মেরে ফেলে বলেই ইসলামে মাদকের উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয়, বহন ও সেবন সবকিছুকেই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে মাদকাসক্তির পেছনে একাধিক পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বন্ধুবান্ধবের চাপ বা কৌতূহলবশত প্রথমবার মাদক গ্রহণ করাই সবচেয়ে সাধারণ সূচনা-বিন্দু, বিশেষত কিশোর-তরুণদের ক্ষেত্রে।
এছাড়া পারিবারিক অবহেলা, বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব, একাকিত্ব এবং মানসিক চাপ মোকাবেলার সঠিক দক্ষতার অভাবকেও গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একাধিক গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিক সচেতনতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর কাউন্সেলিং ব্যবস্থা থাকলে আসক্তির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবার সমস্যাটি বুঝে ওঠার আগেই তা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
মাদকাসক্তি কখনোই কেবল একজন ব্যক্তির সমস্যা থাকে না তা ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলে গোটা একটি পরিবারকে। ধরা যাক, এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান বন্ধুদের প্ররোচনায় মাদকে জড়িয়ে পড়ে। শুরুতে সামান্য কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া এই অভ্যাস কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে সম্পূর্ণ আসক্তিতে পরিণত করে।
প্রতিদিনের মাদকের খরচ মেটাতে সে প্রথমে ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে, এরপর বাবা-মায়ের সঞ্চয় ও গয়না চুরি করে, এবং একসময় পারিবারিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের পরিবারে বাবা-মায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও লজ্জা, ভাইবোনদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, আর্থিক সংকট চরমে পৌঁছায় এবং সবচেয়ে দুঃখজনকভাবে পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানের মাদকাসক্তির কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়ে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের চেয়েও কঠিন কাজ হলো তার পরিবারের ভাঙা মানসিক অবস্থা পুনর্গঠন করা, কারণ দীর্ঘমেয়াদি এই মানসিক আঘাত পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে অবিশ্বাস ও ভীতির জন্ম দেয়, যা সহজে সারে না।
মাদকাসক্তি একটি ব্যক্তিকে কেবল শারীরিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করে না, বরং তাকে ক্রমশ সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়। মাদকের নেশা বজায় রাখতে প্রতিদিন যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তা বৈধ উপায়ে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে উঠলে আসক্ত ব্যক্তি চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা এমনকির সহিংস অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিয়মিত অভিযান ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মাদক অপরাধের বিচার দ্রুততর করতে বিশেষ বিচারিক ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়।
এছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনে সারাদেশে অভিযান পরিচালনা, বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনার লাইসেন্স প্রদান এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করার মতো উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।
কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবল আইন বা সরকারের একক প্রচেষ্টায় মাদকের বিস্তার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমানো সম্ভব হচ্ছে না, যার অন্যতম প্রধান কারণ আইনশৃঙ্খলার কাঠামোগত সীমার বাইরে থাকা বহুমাত্রিক সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সংকট।
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান রুট হিসেবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহৃত হওয়া, ডার্কওয়েব বা এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনে মাদকের লেনদেন ছড়িয়ে পড়া এবং পারিবারিক সচেতনতার অভাব সরকারকে এই প্রচেষ্টাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে। এসব মিলিয়েই কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যাটির সম্পূর্ণ সমাধান কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা তাই মনে করেন, আইনি কঠোরতার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে চাহিদা হ্রাস, সচেতনতা বৃদ্ধি ও পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।