মূল সংবাদে যান
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

বন্দর থেকে ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচার, ঢাকায় আটক

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
বন্দর থেকে ৭ কোটি টাকার পণ্য পাচার, ঢাকায় আটক

দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরে শুল্ক ফাঁকি চক্রের তৎপরতায় একের পর এক আমদানি পণ্যের চালান অনায়াসে পাচার হওয়ার ঘটনায় কাস্টমস ও বন্দর ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী মহল।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকে ৭ কোটি টাকা মূল্যের উচ্চ শুল্কযুক্ত সিনথেটিক ফেব্রিক, শাড়ি ও থ্রিপিসের দুই ট্রাক পণ্য শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই বের করে নিয়ে যায় বেনাপোলের শুল্ক ফাঁকি ও নো-এন্ট্রি সিন্ডিকেটের সদস্যরা।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও বন্দরের শেড ইনচার্জের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থের চুক্তিতে পণ্য চালানটি শেড থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। নানা চেষ্টা চালিয়েও পণ্য চালানটি আটক করা যায়নি।

পরে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা কোতোয়ালি থানা পুলিশ পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাট এলাকার একটি গুদাম থেকে পণ্য চালানটি আটক করে।

এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তবে মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তাঁরা বেনাপোলকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের সদস্য বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ভারত থেকে কাগজপত্রবিহীন তিন ট্রাক পণ্য নিয়ে আসে এ চক্রটি। ভারতীয় ট্রাক থেকে পণ্যগুলো বেনাপোল বন্দরের ৪১ নম্বর শেডে খালাস করা হয়। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পণ্য চালানটি বন্দর থেকে পাচারের তথ্য পেয়ে এনএসআই বিষয়টি কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানায়।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা বন্দরের ৪১ নম্বর শেডে গিয়ে ভারতীয় তিনটি ট্রাকের পণ্য আটক করেন। ওই চালানে বাংলাদেশি চার ট্রাক শাড়ি, থ্রিপিস ও ফেব্রিক ছিল। যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা পণ্য চালানটি দেখভালের দায়িত্ব দেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানকে।

কিন্তু দায়িত্বে অবহেলা ও শুল্ক ফাঁকি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে বলা হচ্ছে, মঈন উদ্দিন আরমান বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শেডে থাকা চার ট্রাক পণ্যের মধ্যে দুই ট্রাক পণ্য বের করে দেন। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার গভীর রাতে এনএসআইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে পুরান ঢাকায় পণ্যগুলো জব্দ করে পুলিশ।

সাত কোটি টাকা মূল্যের দুই ট্রাক পণ্য বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা নিজে বিজিবি-কাস্টমসের যৌথ চেকপোস্টে গিয়ে ট্রাক দুটি আটক করার নির্দেশ দেন।

ট্রাক দুটি হলো ঢাকা ট্রান্সপোর্টের ঢাকা মেট্রো-ট-২২-৭৪৭১ এবং আফজাল পার্সেল ট্রান্সপোর্টের ঢাকা মেট্রো-ট-২৪-০৮৪৭। ট্রাক দুটি আটক করতে যশোরসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও সেগুলো আটক করা সম্ভব হয়নি।

বৃহস্পতিবার রাতে ট্রাক দুটি আটক করার জন্য পদ্মা সেতুর টোল প্লাজায় যোগাযোগ করা হয়। একই সঙ্গে এনএসআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। সারারাত অভিযানের পর পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটের সামাদ প্লাজার নিচে অবস্থিত একটি গুদাম থেকে এক ট্রাক (১২০ বস্তা) অবৈধ ভারতীয় কাপড় জব্দ করে পুলিশ।

এ সময় সাইফুর রহমান (৩৭), সংগ্রাম হোসেন (৩০) ও বাবু (৩৭) নামে তিন ব্যক্তিকে আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। তাঁদের বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা কোতোয়ালি থানায় পুলিশ বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি মো. রবিউল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে আসা বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কাপড় জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাতেনাতে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আটক ব্যক্তিরা অবৈধভাবে ভারতীয় কাপড় সংগ্রহ, মজুত ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জব্দ করা কাপড়ের উৎস এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বেনাপোল কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার নেতৃত্বে তদন্ত, গবেষণা ও ব্যবস্থাপনা ইউনিটের (আইআরএম) একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানকে অনুপস্থিত দেখতে পায়। পরে তাঁকে দায়িত্বে না থাকার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার ক্ষুব্ধ হয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। এআরওকে প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে কাস্টমসের রাজস্ব ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। কয়েক ঘণ্টা কাজও বন্ধ রাখেন তাঁরা।

ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দর দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর। এখানে কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাপ্তরিক কোনো সিদ্ধান্ত বা দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তা বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তাঁরা বলেন, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কর্মস্থলে কোনো কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ সত্য হলে সেটিও প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। যা বলার, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে জানান তিনি।

বন্দরের একটি সূত্র জানায়, বেনাপোল বন্দর থেকে পণ্য পাচারের ঘটনায় কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মঈন উদ্দিন আরমানসহ বেনাপোল স্থলবন্দরের একাধিক কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট মহলের সুষ্ঠু তদন্তে বিষয়টি বেরিয়ে আসবে বলে সূত্রটি দাবি করেছে। একই সঙ্গে বন্দরের ৪১ নম্বর শেডে মিথ্যা ঘোষণায় আনা আরও কয়েক কোটি টাকার পণ্য চালান জব্দ করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া গত আট মাসে ৪১ নম্বর শেড থেকে মিথ্যা ঘোষণা ও জাল-জালিয়াতির কাগজপত্র ব্যবহার করে কী পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য চালান বেরিয়ে গেছে, তা তদন্ত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা দল কাজ শুরু করেছে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) রুহুল আমিন জানান, নতুন করে ওঠা অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রবিবার এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার কাছে সাংবাদিকেরা সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় কাস্টমস ও বন্দরের অভিযুক্ত বা সহায়তাকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বন্দর ও কাস্টমস হাউসের শৃঙ্খলা নষ্ট হবে। একই সঙ্গে এ বন্দর থেকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
আগের সংবাদ

উড্ডয়নের পর খুলে পড়ল বিমানের চাকা, জরুরি অবতরণ

পরের সংবাদ

লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারে বাড়বে চালকদের আয়: অমিত

আরও পড়ুন

বিভাগভিত্তিক আরও সংবাদ

বিভিন্ন বিভাগের সাম্প্রতিক ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এক জায়গায় পড়ুন।