আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?", "আমার ভাইয়ের হত্যাকারীর ফাঁসি চাই"—এমনই তীব্র ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের ক্ষুরধার স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো সাতক্ষীরা শহর। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী জাকারিয়া খানকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার প্রতিবাদে এবং ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে সর্বস্তরের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।
ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং কিশোর গ্যাং কালচার নির্মূলে আসামিদের দ্রুত ফাঁসির দাবিতে শহরজুড়ে টানা মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকাল থেকেই দফায় দফায় এসব প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করা হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
পরবর্তীতে দুপুর ১২টায় সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে শোকাহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের এক বিশাল জনস্রোত নামে। মানববন্ধন শেষে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, নিহত জাকারিয়া খান ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ থেকে অংশ নিয়েছিলেন। গত ২ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়ের (পশু হাসপাতাল) প্রধান ফটক সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের সামনে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যের মধ্যে উসকানি, বাকবিতণ্ডা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এ সময় পরিবেশ শান্ত করতে এবং সংঘাত থামাতে একপ্রকার মানবিক তাগিদেই এগিয়ে যান সাধারণ শিক্ষার্থী জাকারিয়া। কিন্তু এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সন্ত্রাসী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তারা অহেতুক জাকারিয়ার ওপর চড়াও হয় এবং একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার বুকে মারাত্মক আঘাত করে। মারাত্মক রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহত জাকারিয়ার বড় ভাই মো. শাহরিয়ার খান বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যেই মামলার প্রধান আসামি ও চিহ্নিত কিশোর গ্যাং লিডার নাহিদসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
এদিনের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবুল হাশেম, সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক বাসুদেব বসু, সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহীন ইসলাম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সাতক্ষীরার আহ্বায়ক মো. আরাফাত হোসাইন এবং কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মাসুদুল আলম।
সহপাঠীকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই রাজপথে বিচার চাইতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষার্থীরা। বক্তব্যে সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবুল হাশেম ও সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক বাসুদেব বসু বলেন, "জাকারিয়া ছিলেন একজন উদীয়মান ও স্বপ্নবাজ তরুণ। অথচ সহিংসতার বলিকাপে অকালে ঝরে গেল একটি সম্ভাবনাময় প্রাণ। এ ধরনের নির্মম ঘটনা পুরো শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাজের নিরাপত্তার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমরা অবিলম্বে জাকারিয়া হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।"
জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহীন ইসলাম ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক মো. আরাফাত হোসাইন যৌথভাবে অভিযোগ করে বলেন, "একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরায় এই কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান ঘটেছে। এরা পুরো এলাকায় ছিনতাই, মারামারি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আমরা প্রশাসনকে বলতে চাই, জেলা থেকে স্থায়ীভাবে কিশোর গ্যাং কালচার উপড়ে ফেলতে এখনই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।"
স্বজনদের কান্না ও জেলাজুড়ে তীব্র কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে নিহত জাকারিয়ার বড় ভাই ও মামলার বাদী মো. শাহরিয়ার খান এবং ফুফাতো ভাই তামিম বলেন, "আমার নিরা অপরাধী ভাইকে অকালে ও নির্মমভাবে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা তদন্তের নামে কোনো ধরনের তালবাহানা দেখতে চাই না। সরাসরি ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসি চাই। আমার ভাই আজ কবরে শুয়ে আছে, অথচ ঘটনার নেপথ্যে থাকা অন্যান্য মদদদাতারা এখনও অধরা থাকতে পারে না।"
মানববন্ধনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, জাকারিয়া হত্যার বিচার শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো দেশের ছাত্রসমাজের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দাবি। পুলিশি তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে জড়িত সকল আসামির মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা না হলে, ভবিষ্যতে পুরো সাতক্ষীরা জেলা অচল করে দেওয়ার মতো আরও কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়া হবে।