দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আলো ছড়ানোর পর বিদায়ের মঞ্চে উঠছেন লিওনেল মেসি।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় ভোরে বুয়েনস এইরেসের ঐতিহাসিক এস্তাদিও মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা।
মেসির বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে এরই মধ্যে ব্যাপক আয়োজন করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)। স্টেডিয়ামের প্রায় সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে দ্রুততম সময়ে। শুধু মাঠেই নয়, বুয়েনস এইরেসের বিভিন্ন প্রান্তেও চলছে বিশেষ আয়োজন।
তবে মেসির মতো একজন কিংবদন্তির বিদায়ী ম্যাচের প্রতিপক্ষ হিসেবে বেনিন কেন? আফ্রিকার এই দলটির শক্তিই বা কতটা?
বেনিনের র্যাঙ্কিং কত?
ফিফার সর্বশেষ অফিসিয়াল পুরুষ র্যাঙ্কিংয়ে বেনিনের অবস্থান ৯৩তম। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর প্রকাশিত সর্বশেষ তালিকায় আফ্রিকার দলটির এই অবস্থান ছিল। ৭ অক্টোবর নতুন র্যাঙ্কিং প্রকাশের কথা থাকলেও মেসির বিদায়ী ম্যাচের আগে কার্যকর তালিকা অনুযায়ী বেনিন ৯৩ নম্বরে।
বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি আর্জেন্টিনার সঙ্গে র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধানও তাই স্পষ্ট। মেসিদের বিপক্ষে ম্যাচটি বেনিনের জন্য যেমন বড় মঞ্চ, তেমনি আর্জেন্টিনার জন্য এটি মূলত হয়ে উঠেছে মেসিকে বিদায় জানানোর উপলক্ষ।
বেনিন পশ্চিম আফ্রিকার দেশ। দলটি এখনো বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ পায়নি। আফ্রিকান ফুটবলে নিয়মিত প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ সারির দলগুলোর মধ্যে বেনিনকে ধরা হয় না।
কেন বেনিনকে বেছে নেয়া হলো?
মেসির বিদায়ী ম্যাচের জন্য বেনিনকে বেছে নেয়ার পেছনে মূল বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক সূচি ও প্রস্তুতি। ম্যাচটি প্রতিযোগিতামূলক কোনো টুর্নামেন্টের অংশ নয়; এটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ।
অর্থাৎ আর্জেন্টিনার জন্য ম্যাচটির ফলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মেসিকে ঘিরে বিদায়ী আয়োজন। ২০২৬ বিশ্বকাপের পর নতুন আন্তর্জাতিক চক্রে প্রবেশের আগে এই ম্যাচে দলের খেলোয়াড়দেরও নিজেদের প্রস্তুত করার সুযোগ থাকছে। আর মেসির জন্য এটি হয়ে উঠছে দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।
বাংলাদেশ সময় কখন ম্যাচ?
আর্জেন্টিনা ও বেনিনের ম্যাচটি বুয়েনস এইরেসের স্থানীয় সময় ৬ অক্টোবর রাত ৮টায় শুরু হবে। বাংলাদেশ আর্জেন্টিনার সময়ের চেয়ে ৯ ঘণ্টা এগিয়ে থাকায় ম্যাচটি ঢাকার সময় ৭ অক্টোবর ভোর ৫টায় শুরু হবে।
মেসির বিদায়ী ম্যাচের টিকিট বিক্রি নিয়েও তৈরি হয় তুমুল উন্মাদনা। ২৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় দেপোর্তিক প্ল্যাটফর্মে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক সমর্থক ভার্চুয়াল লাইনে ঢুকে পড়েন।
চাহিদা এতটাই বেশি ছিল যে মাত্র প্রায় ৯০ মিনিটের মধ্যেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ক্ল্যারিন ও লা নাসিওন এ তথ্য জানিয়েছে।
টিকিটের দামও ছিল উল্লেখযোগ্য। সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম শুরু হয় ৯০ হাজার আর্জেন্টাইন পেসো থেকে। সবচেয়ে দামি আসনের মূল্য ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার পেসো।
মেসিকে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখতে মনুমেন্টালে প্রায় ৮৫ হাজার দর্শক উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে। মেসির বিদায় শুধু মনুমেন্টালেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তার সম্মানে এএফএ আয়োজন করেছে ‘গ্রাসিয়াস লিও ফ্যান ফেস্ট’।
৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বুয়েনস এইরেসের ইউবিএ সিউদাদ ইউনিভার্সিতারিয়া এলাকায় চলবে এই আয়োজন। সেখানে বড় পর্দায় সরাসরি দেখানো হবে আর্জেন্টিনা-বেনিন ম্যাচ। ফ্যান ফেস্টে থাকছে সংগীত, খাবার, বিভিন্ন গেম, ইন্টার্যাকটিভ আয়োজন, ডিজে পারফরম্যান্স, বিশেষ অতিথি, ইনফ্লুয়েন্সার ও স্ট্রিমারদের উপস্থিতি।
ভক্তদের জন্য থাকবে আর্জেন্টিনার জেতা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার ট্রফির সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ। মেসির ১০ নম্বর জার্সি ও বিশ্বকাপকে ঘিরেও থাকছে বিশেষ প্রদর্শনী।
বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থরাও থাকছেন
মেসির বিদায়ী ম্যাচকে স্মরণীয় করে তুলতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের সদস্য ও তাদের পরিবারকে। কাতার বিশ্বকাপজয়ী দলের অনেক পরিচিত মুখকে তাই মনুমেন্টালে দেখা যেতে পারে। মেসির দীর্ঘদিনের সতীর্থ অ্যাঞ্জেল দি মারিয়াও থাকবেন বলে জানা গেছে।
রদ্রিগো দি পল ও জিওভানি লো সেলসোকেও এই বিশেষ ম্যাচের দলে রাখা হয়েছে। আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দির ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা; ফলে মেসির সঙ্গে তারও শেষ ম্যাচ হয়ে যেতে পারে এটি।
মেসির জন্য বিশেষ জার্সি
বিদায়ী ম্যাচকে আরও বিশেষ করে তুলতে আর্জেন্টিনা পরবে মেসিকে ঘিরে তৈরি বিশেষ সংস্করণের জার্সি। অ্যাডিডাসের তৈরি জার্সিটিতে ঐতিহ্যবাহী আকাশি-সাদার সঙ্গে রয়েছে সোনালি নকশা এবং মেসির ক্যারিয়ারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া বিশেষ উপাদান। ৬ অক্টোবরের ম্যাচকে ঘিরেই জার্সিটি তৈরি করা হয়েছে।
এক নজরে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির অভিষেক ২০০৫ সালে। এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় দলের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন তিনি।
তবে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল প্রত্যাশা, সমালোচনা ও হতাশায় ভরা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়; সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার হয়ে বড় শিরোপা জিততে মেসিকে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে।
২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে আসেন জাতীয় দলে। এরপরই আসে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সোনালি অধ্যায়।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে তার বড় অর্জনগুলো হলো-
২০২১ কোপা আমেরিকা: ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা
২০২২ ফাইনালিসিমা: ইতালিকে হারিয়ে শিরোপা
২০২২ বিশ্বকাপ: ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
২০২৪ কোপা আমেরিকা: টানা দ্বিতীয় কোপা আমেরিকা জয়
২০২৬ বিশ্বকাপ: নেতৃত্ব দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন
কাতার বিশ্বকাপে সাত গোল করে গোল্ডেন বল জেতেন মেসি। সেই বিশ্বকাপ জয় পূর্ণতা দেয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে। আর্জেন্টিনার হয়ে তার পরিসংখ্যানও অনন্য। বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামলে জাতীয় দলের হয়ে তার ম্যাচসংখ্যা দাঁড়াবে ২০৮-এ। গোলসংখ্যা ইতোমধ্যেই ১২৫, যা আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
১০ নম্বর জার্সির কী হবে?
মেসির বিদায়ের সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি, এরপর আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি কে পরবেন? কোচ লিওনেল স্কালোনি জানিয়েছেন, মেসির বিদায়ের পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মেসির উপস্থিতি থাকা অবস্থায় তার বিখ্যাত ১০ নম্বর অন্য কারও গায়ে দেখার প্রশ্নই আসে না। অর্থাৎ বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে আরও একবার ১০ নম্বর জার্সিতে দেখা যাবে আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে। তবে মেসি যুগের পর ১০ নম্বর জার্সির দৌড়ে নিকো পাজ, মাস্তানতুয়োনো ও অ্যালেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টাররা আলোচনায় রয়েছেন।