২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই নদী ও সাগরে মাছ ধরতে শুরু করেন জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় বরিশাল বিভাগের প্রায় চার লাখ জেলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে। কক্সবাজারের জেলেরাও সাগরে মাছ ধরতে শুরু করেছেন।
শুক্রবার ভোর থেকে চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ আসতে শুরু করে। সকাল ১০টা পর্যন্ত সেখানে প্রায় ১ হাজার টন ইলিশ নামানো হয়, যার ৭০ শতাংশই ছোট ও নরম।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা এসব ইলিশ মাছঘাটে নিয়ে আসেন। এর ৩০ শতাংশ পদ্মা-মেঘনার ইলিশ, বাকি ৭০ শতাংশ নোয়াখালী ও ভোলার।
এদিকে, বরিশালের বাজারগুলোতে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। দামও কিছুটা কমেছে।
পোর্ট রোডের পাইকারি মাছ বিক্রেতা উজ্জ্বল রায় বলেন, বাজারে প্রচুর মাছ আসায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে, নিষেধাজ্ঞার সময় বরফ সরবরাহ না থাকায় মাছ সংরক্ষণে সমস্যা হয়েছে। ফলে কিছু ইলিশের মান নষ্ট হয়েছে।
মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি খান মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, ৩০০-৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা, ৭০০-৯০০ গ্রাম ১ হাজার ৮০০ টাকা, এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ১০০ টাকা এবং ১ হাজার ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে পরিচালিত অভিযান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে বলে দাবি করেছে মৎস্য বিভাগ। তবে নিষেধাজ্ঞার শেষ দিকে অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা ও কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে।
মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়া, পুলিশ সদস্যের সংকট ও পর্যাপ্ত বাজেটের অভাব অভিযান পরিচালনায় প্রধান বাধা। গত বছরের তুলনায় এবার দৈনিক অভিযানের সংখ্যা প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। একইসঙ্গে মামলা, কারাদণ্ড এবং জব্দ করা ইলিশ ও জালের পরিমাণেও পরিবর্তন এসেছে।
২০২৫ সালে মোট ৩ হাজার ৫৩১ টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ২০ দিনে অভিযান হয়েছে ২ হাজার ৩৩০ টি। গত বছর দৈনিক গড়ে ১৬১ টি অভিযান পরিচালিত হলেও এবার তা কমে ১১৬ টিতে দাঁড়িয়েছে।
গত বছর এক হাজার ৩৬৩ টি মামলা হলেও এবার ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত হয়েছে ৬৯০ টি। গত বছর ৮৯৩ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা ৫০৭। গত বছর ৮ দশমিক ৮ টন ইলিশ ও ১৩৮ দশমিক ৫৯ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছিল। এবার জব্দ করা হয়েছে ৮ দশমিক ৬ টন ইলিশ ও ১৩১ দশমিক ৬৪ লাখ মিটার জাল।
মৎস্য কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, এ বছর হামলার ভয়াবহতা ও কৌশল আগে দেখা যায়নি। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে অতর্কিত হামলায় সাতজন কর্মকর্তা ও অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তি আহত হন। তিনি বলেন, এখন আমরা জোয়ারের সময় অভিযান চালানোয় জেলেরা বেশি ক্ষিপ্ত হচ্ছেন।
বিভাগীয় মৎস্য কার্যালয়ের পরিচালক কামরুল হাসান বলেন, গত ২৪ অক্টোবরের পর থেকে জেলেরা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। ভোলা, ঝালকাঠি, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জে মৎস্য বিভাগের কর্মীরা হামলার শিকার হয়েছেন।
‘রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা পাওয়া যায়নি। ফলে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হলেও শতভাগ সফল করা সম্ভব হয়নি’ বলে জানান তিনি।
কামরুল হাসান বলেন, গত বছর ইলিশ সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় অভিযান পরিচালনা করায় অভিযানের সংখ্যা বেশি ছিল। এ বছর দুর্গাপূজার সময় নিষেধাজ্ঞার শুরুতে পুলিশ, আনসার ও নৌ-পুলিশের সহযোগিতা পাওয়া যায়নি। এ কারণে অভিযান কম হয়েছে।
এই মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, বিশেষ করে হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও ভোলার কিছু এলাকায় জেলেরা জলদস্যুদের মতো আচরণ করেছেন। এমনকি আমি নিজেও হামলার শিকার হয়েছি। অভিযানের সময় পেট্রল বোমা সদৃশ বস্তু নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে। ‘তারপরও বলব, অভিযান অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। তবে শেষের দিকে হামলার ঘটনা গত বছরের তুলনায় বেড়েছে’ বলেন তিনি।
চাঁদপুরের নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, গত মঙ্গলবার জেলেরা তাদের স্পিডবোট ও ট্রলার ঘিরে ফেলেন। ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় তারা সেখান থেকে সরে আসেন। ‘এবার জেলেরা যেভাবে আচরণ করেছেন, তাতে এভাবে অভিযান পরিচালনা করা অসম্ভব’ বলেন তিনি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির বিভাগীয় সভাপতি ইসরাইল পণ্ডিত বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগে সব অংশীজনের মতামত নিয়ে অভিযান পরিকল্পনা করা উচিত। এ সময় জেলেদের জন্য সরকারের ভিজিএফ সহায়তা বাড়িয়ে ১০০ কেজি চাল করারও দাবি জানান তিনি।
তার অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত অনেকেই প্রকৃত জেলে নন। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় তারা মাছ ধরেন। এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।