আর্জেন্টিনা ৪-০ বলিভিয়া
‘নতুন যুগ।’
ক্যাপশনটি আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের একটি ফেসবুক পোস্টের। মারিও কেম্পেস স্টেডিয়ামে খেলা শুরুর পর করা সেই পোস্টের ছবিতে নিকো পাজ। লিওনেল মেসির কি তা দেখে একটু খারাপ লেগেছে?
এত দিন এসব পোস্টে দেখা যেত মেসিকে। কিংবদন্তি আকাশি-সাদায় শেষ টেনে দেওয়ায় বলিভিয়ার বিপক্ষে এই প্রীতি ম্যাচ দিয়ে নতুন যুগের দ্বার খুলল আর্জেন্টিনা। অন্যভাবে বললে, সেই দ্বার খুলেছেন এমন কেউ, যাঁকে আর্জেন্টাইনরা ভেবে রেখেছেন মেসির উত্তরসূরি হিসেবে। নিকো পাজ!
চোখধাঁধানো একটি গোল, তারপর সেট পিস থেকে গোল করানো। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি গায়ে মেসি যা করে এসেছেন আরকি! পাজ সেই দায়িত্বই পালন করলেন আর্জেন্টিনার ৪-০ গোলে জয়ের এই ম্যাচে। ১০ নম্বর জার্সি তাঁর গায়ে ছিল না। তবে ২৮ মিনিটে গোলটি দেখে মেসির ইচ্ছা হতে পারে ওই জার্সিটা এখনই তাঁর গায়ে তুলে দিতে!
এজেকুয়েল পালাসিওসের রক্ষণচেরা পাসটাও ছিল মেসির মতোই। খুবই সরু ফাঁকা জায়গা ধরে থ্রু পাস। পাজ দৌড়ে সেই পাস ধরে বলিভিয়া গোলকিপার গিয়ের্মো ভিসকারার মাথার পাশ দিয়ে যে চিপটি করলেন, সেটা অবিকল মেসির মতোই। যেন মেসির অনুপস্থিতিতে নতুন যুগেরই হাতবদল হলো একই সুরে, একই ছন্দে!
লাওতারো মার্তিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও ফ্লাকো লোপেজ সেই সুর-ছন্দকে আরও সুন্দর করে তুলেছেন গোল করে। কোচ লিওনেল স্কালোনির যুগে আর্জেন্টিনা কখনো টানা দুই ম্যাচ হারেনি। গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর আর্জেন্টিার এই প্রথম ম্যাচে জয়টা তাই অবধারিতই ছিল। মেসি জাতীয় দলকে বিদায় বলার পর আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচে সেটাই এল খানিকটা বিরহ-মধুর সুরে, স্বাদে।
প্রশ্ন উঠেছিল, মেসির অনুপস্থিতিতে স্কালোনির খেলানোর কৌশল কী হবে? ৪-৪-২ ফর্মেশনে আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্তিনেজকে রেখে উত্তরটা ভালোই দিয়েছেন আর্জেন্টিনা কোচ। ১৮ মিনিটে মার্তিনেজের গোলটিও স্কালোনির এই আস্থার প্রতিদান। আর এই গোলের উৎসেও কারও কারও হয়তো মেসিকে মনে পড়েছে, মন পুড়েছে। কিংবদন্তির চিরচেনা সেই থ্রু পাসের মতোই অ্যালেক্সিস ম্যাক-অ্যালিস্টারের পাসটি ধরেন মার্তিনেজ। লাতিন ছন্দে একবার ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে তাঁর নেওয়া শটটি জাত স্ট্রাইকারদের গোল।
ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি বলেছিলেন, মেসির অনুপস্থিতে আর্জেন্টিনার খেলার মৌলিক ধারাগুলো পাল্টাবে না। সেই ছোট ছোট পাস এবং ছদ্ধবদ্ধভাবে সদলবলে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ঢুকতে দেখা গেল আর্জেন্টিনাকে। কন্ডাক্টরের ভূমিকায় ছিলেন পাজ। সেট পিস নেওয়ার দায়িত্বও ছিল তাঁর। বোঝা গেল, এখন ১৮ নম্বর জার্সি পরলে কী হবে, সামনে ১০ আসছে! ৫৩ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে সেট পিসে বল একদম রোমেরোর মাথার ওপর ফেলে সেই দাবিও আরও জোরালো করলেন কোমো প্লে-মেকার। রোমেরোকে শুধু দূরের পোস্টে হেডে গোলের আনুষ্ঠানিকতাটুকু মারতে হলো।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৭৭তম লাতিন দলটির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বাকি ছিল শুধু বেঞ্চের গোল পাওয়া। কাছ থেকে করা শটে ৮৬ মিনিটে সেটাও এনে দেন মাথায় আঘাত পাওয়া মার্তিনেজের বদলি নামা ফ্লাকো লোপেজ। বলিভিয়া ততক্ষণেও আর্জেন্টিনার পোস্টে একটি শটও রাখতে পারেনি। পারেনি পুরো ম্যাচেও। উল্টো ১৮টি শটের মধ্যে মাত্র ৬টি কীভাবে বলিভিয়ার পোস্টে থাকল, খেলোয়াড়দের কাছে সেই ব্যাখ্যা চাইতে পারেন স্কালোনি। বল দখলে রাখার হারও (৬৯%) নিশ্চয়ই আরেকটু বেশি প্রত্যাশিত ছিল?
কর্দোবা থেকে দূরে কোথাও বসে মেসি হয়তো ভাবতে পারেন, তিনি থাকলে কী আকাশি-সাদা রংটা আরেকটু বেশি উজ্জ্বল লাগত? সে সুযোগ আর একবারই পাবেন কিংবদন্তি।
এই আন্তর্জাতিক বিরতিতে আরও দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। বাংলাদেশ সময় আগামী রোববার ভোরে তাদের প্রতিপক্ষ বুরকিনা ফাসো, এরপর আগামী বুধবার শেষ প্রতিপক্ষ বেনিন। এই শেষ ম্যাচ হবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসিরও শেষ ম্যাচ। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ঘরের ছেলেকে বিদায় জানাবেন আর্জেন্টাইনরা। আর আজ কর্দোবায় যে স্টেডিয়ামে খেলা হলো, সেখানে জাতীয় দলের কোচ হিসেবে ঘরের দর্শকদের সামনে অভিষেক হয়েছিল স্কালোনির। এমন লগ্নে কোচও কি মিস করেছেন তাঁর প্রিয় শিষ্যকে? সে তো বটেই।
স্কালোনি হয়তো থাকবেন নতুন মেয়াদে। তাই মেসিকে মিস করাটা সইয়ে নিতে হবে। অবশ্য এখন মানিয়ে নিতে হবে অনেক কিছুতেই। যেমন ধরুন, রদ্রিগো দি পল ও লিয়ান্দ্রো পারেদেসের মধ্যে কেউ না থাকায় এই ম্যাচে একটি বিষয় দেখা যায়নি। ২০২১ কোপা আমেরিকা থেকে দুজনই আর্জেন্টিনার ম্যাচ শুরুর আগে মাঠে ক্যান্ডি চিবোনাটা ‘রিচুয়াল’-এ পরিণত করেছিলেন। তাঁদের কেউ ছিলেন না।
হ্যাঁ, নতুন বিশ্বকাপচক্র সামনে রেখে রুপান্তর শুরু হয়েছে আর্জেন্টিনা দলে। যেখানে থাকবেন না মেসি, জায়গাটা নেবেন হয়তো তিনজন মিলে, পাজ-আলভারেজ-মার্তিনেজ!