গাজীপুর শহরকে ময়লা-আবর্জনার হাত থেকে বাঁচাতে সংরক্ষিত বনের বুক চিরে সরাসরি একটি রাস্তা তৈরি করেছে স্থানীয় পৌরসভা।
এরপর শালবনঘেরা এই বনের সীমানা ঘেঁষেই গড়ে তোলা হয়েছে 'পাচুলটিয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট'। শ্রীপুর উপজেলা পরিষদ থেকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার দূরে বনে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে এক রহস্যময় পথের।
পাকা রাস্তাটি ঠিক একটি ট্রাক চলাচলের উপযোগী করে চওড়া করা হয়েছে—যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ভারী যানবাহন চলাচলের জন্য এটি নির্মিত।
বনের গহীনে চলে যাওয়া সেই পথ ধরে এগোতেই চোখে পড়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। দেশের অন্যতম শালবনের ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বিশাল বর্জ্য শোধনাগার।
দীর্ঘদিন ধরে শ্রীপুরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে টনের পর টন ময়লা-আবর্জনা জমে পাহাড়ের রূপ নিয়েছে। একসময় শ্রীপুর ছিল প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়ার আদর্শ জায়গা। ঢাকার যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে মানুষ এখানে ছুটে আসত। কিন্তু বর্তমানে শ্রীপুর নামটি যেন এক বিশাল ময়লার ভাগাড়ের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজীপুর জেলায় অবস্থিত এই জনপদকে অতিরিক্ত শিল্পায়নের জন্য বড় মাশুল দিতে হচ্ছে।
শিল্পাঞ্চল হওয়ার পর পুরো অঞ্চলে যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা তা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এরই প্রেক্ষিতে পৌরসভা একটি শোধনাগার তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়—যেখানে ময়লা শুধু ফেলা হবে না, বরং তা শোধন, স্থানান্তর ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হবে।
মূল সমস্যাটি দেখা দিয়েছে এই 'পাচুলটিয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট'-এর স্থান নির্বাচন নিয়ে। শহরকে ময়লা-আবর্জনার হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে পৌরসভা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বুক চিরে রাস্তা তৈরি করেছে।
বন বিভাগের নথিপত্র অনুযায়ী, যে জায়গাটি সরকারি গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বন, ঠিক সেখানেই—চারিদিকে শালগাছে ঘেরা বনের মুখে এই প্ল্যান্টটি স্থাপন করা হয়েছে।
বনের এই অংশটি মূলত বিশাল মধুপুর শালবনেরই একটি অংশ, যা বাংলাদেশের এক অনন্য বাস্তুতন্ত্র। একসময় এই বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে চিতাবাঘ, হাতি আর রয়েল বেঙ্গল টাইগার ঘুরে বেড়াত।
কিন্তু বর্তমানে জীববৈচিত্র্যের চরম অবনতি ঘটায় এই বনে কেবল হরিণ, পেঁচা, কোবরা, অজগর আর হাতেগোনা কিছু প্রজাতির প্রাণী টিকে আছে। এই সংকটাপন্ন বনের ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছে শ্রীপুরের বর্জ্য ফেলার অবকাঠামো।
শোধনাগারটির নির্মাণকাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভেতরে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ভারী যন্ত্রপাতি ও জেনারেটরের একটানা ঘড়ঘড় শব্দ সারাদিন বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। এই শব্দ সীমানা প্রাচীর পেরিয়েও স্পষ্ট শোনা যায়।
সীমানা প্রাচীরটি ঠিক বনের গা ঘেঁষে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যা বর্জ্য শোধনাগারের কার্যক্রম আর পেছনের শালবনটির মাঝে টিকে থাকা এক ক্ষীণ সীমানারেখা।
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে এই শোধনাগারের পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে। বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট নির্মাণ বা পরিচালনা করার আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক।
কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, শ্রীপুর পৌরসভার এই 'পাচুলটিয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট'-এর জন্য আজ পর্যন্ত কোনো ধরনের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।