রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ক্যামেরার পর এবার ড্রোন সার্ভিল্যান্স চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
প্রাথমিকভাবে একটি ড্রোন দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও যানজটপ্রবণ এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
ড্রোনের মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহন শনাক্ত, চালকদের সতর্কবার্তা দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে অটোমেটেড নম্বর প্লেট রিডার (এএনপিআর) প্রযুক্তি যুক্ত করে ভিডিও মামলা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ট্রাফিকে নতুন এ প্রযুক্তি যুক্ত হলে রাজধানীতে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করছে ডিএমপি।
সম্প্রতি ডিএমপি সদর দপ্তরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ পরিকল্পনার কথা জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান।
তিনি বলেন, ড্রোন সার্ভিল্যান্স পৃথিবীর বহু দেশে আছে। তবে এটি আমাদের জন্য একেবারে নতুন একটি কনসেপ্ট। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, সড়কের পাশাপাশি ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতেও যানজট তৈরি হয়।
অনেক সময় এসব যানজটের সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না বা জানতে দেরি হয়। সেজন্য আমরা চিন্তা করেছি, গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জায়গায় যদি ড্রোন সার্ভিল্যান্স চালু করতে পারি, তাহলে এটি আমাদের তাৎক্ষণিক রিয়েল-টাইম তথ্য দেবে। এতে আমাদের জন্য নির্দেশনা দেওয়া সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, ড্রোনে যদি অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন (এএনপিআর) প্রযুক্তি সংযুক্ত করা হয়, তাহলে এখান থেকে ভিডিও মামলা দেওয়া সম্ভব হবে।
আনিছুর রহমান বলেন, ঢাকা শহরে সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো বাসগুলো নির্দিষ্ট বাসস্টপেজে থামে না। এটা না থামার প্রধান কারণ হচ্ছে বাসগুলো মালিকপক্ষ থেকে কনট্রাক্ট দেওয়া হয়। এগুলো মালিকের নিয়ন্ত্রণে নেই। শ্রমিকেরা বাস কনট্রাক্ট নিয়ে চালায়।
বাসের কন্ডিশন অনুযায়ী প্রতিদিন তারা মালিককে টাকা দেয়। এই টাকা দেওয়ার ফলে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে যে তাকে প্রতিদিনের টাকা প্রতিদিন দিতে হবে, আদায় করতে হবে। প্রতিযোগিতার কারণে বাসগুলো যাত্রীছাউনিতে না থামিয়ে ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে থামে এবং পেছনের পুরো রাস্তা ব্লক করে দেয়।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে নির্দিষ্ট সময় পরপর বাস চলাচল করে। কোন বাসের পর কোন বাস আসবে এবং কোন বাস কখন কোথায় দাঁড়াবে সবকিছু একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আমাদের দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে বাসগুলো যাত্রী পাওয়ার জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে।
ফলে ঢাকা শহরের প্রায় সব বাসের গায়ে অসংখ্য দাগ ও ক্ষত দেখা যায়। দেখতে অনেকটা বসন্ত রোগীর মুখের মতো। এটা যত দিন পর্যন্ত বন্ধ না হবে এবং ই-টিকিটিং সিস্টেম ও বাস রুট রেশনালাইজেশন—এই দুটি কাজ যত দিন আমরা যথাযথভাবে করতে না পারব, তত দিন পর্যন্ত এই ভোগান্তি কমবে না।
ড্রোনগুলো ঠিক কী ধরনের কাজ করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ড্রোনে ভয়েস বা শব্দের ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে আইন ভঙ্গকারী যানবাহনকে সতর্কবার্তা দেওয়া যাবে। যেমন—কোনো গাড়ি যানজট সৃষ্টি করলে ড্রোন থেকে বলা যাবে, আপনি যানজট সৃষ্টি করছেন, সরে যান।
তিনি বলেন, ড্রোনের মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় মামলাও করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। তবে এটি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। একটি সংস্থা পরীক্ষামূলকভাবে আমাদের কাছে একটি ড্রোন দিয়েছে। আমরা সেটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। আশা করছি, খুব দ্রুত এটি নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে পারব।
ড্রোনের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম ডেটা সরাসরি পাওয়া যাবে কি না জানতে চাইলে আনিছুর রহমান বলেন, একদম রিয়েল-টাইম ডেটা পাওয়া সম্ভব। তবে এগুলো পেতে আমাদের অবকাঠামো লাগবে। কারণ এগুলো সবই হচ্ছে ইন্টারনেটভিত্তিক, সার্ভারভিত্তিক। এগুলোর জন্য জায়গা দরকার, অবকাঠামো দরকার। এগুলোর জন্য ব্যয় আছে। কারণ প্রতি মুহূর্তেই খরচ। আপনি যখন ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন, ইন্টারনেট তো আপনাকে কারও না কারও কাছ থেকে নিতে হবে। সেখানে পয়সা খরচ হবে।
ড্রোনের মাধ্যমে যে মামলা হবে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে, নাকি ফুটেজ দেখে ম্যানুয়ালি মামলা দেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়ার পর্যায়ে যাইনি। তবে এভাবে মামলা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। আমরা এ দেশেরই নাগরিক এবং এখানেই বসবাস করি। তাই আমরা চাই, কারও সঙ্গে যেন সামান্যও অনিয়ম বা অন্যায় না হয়। এ কারণে আমরা মামলার ফুটেজগুলো প্রথমে বিশ্লেষণ করি। এরপর মামলা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, আমি বারবার সবাইকে একটি কথা বলি মামলার সংখ্যা দিয়ে কখনো কাজের মান বিচার করা যায় না। বরং বেশি মামলা হওয়ার অর্থ হলো, বেশি মানুষ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করছে। আমাদের লক্ষ্য বেশি মামলা দেওয়া নয়। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো—মানুষ যেন সড়ক আইন মেনে চলে।
ড্রোন পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ দরকার আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, ড্রোন চালানো একটি কারিগরি বিষয়। তাই তারা ইতিমধ্যে সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেছেন। প্রথমে তেজগাঁও বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সেখানে একটি দল ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পরবর্তী ধাপে উত্তরা বিভাগের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। আগামী সপ্তাহ থেকে তাঁদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে।
আনিছুর রহমান বলেন, শুরুতে কিছুটা সময় লাগবে। কারণ আমরা আগে এভাবে কাজ করিনি। আমরা প্রথমে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ে কাজ শুরু করেছি। শাহবাগ থেকে শুরু করে ১৪টি এবং লেক রোডে একটি মোট ১৫টি সিগন্যাল এআই প্রযুক্তির আওতায় আনা হয়েছে। এর পাশাপাশি ডিএমপির অন্যান্য সিগন্যালও রয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা প্রথমে দেখতে চেয়েছিলাম, এই ব্যবস্থা কাজ করে কি না। আপাতত কাজ করছে। তবে সমস্যা যে নেই, তা নয়। সমস্যা রয়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি, মানুষ যেন ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলতে শেখে।
তবে এই অভ্যাস তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগছে। আশা করি, ড্রোনের ক্ষেত্রেও সময় লাগবে। আমরা এটি পরীক্ষা করে দেখব। যদি কোনো নেতিবাচক দিক দেখা যায়, তাহলে এটি চালু করা হবে না।