মূল সংবাদে যান
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন রোনালদো

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন রোনালদো

দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগাল জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকা। তবে বিদায়টা এখনই নয়, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সি তুলে রাখার পরিকল্পনা তার।

কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে বিরোধের জেরে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা চলছিল। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আবারও পর্তুগালের জার্সিতে ফিরবেন কি না, সেই প্রশ্নের মধ্যেই এবার অবসরের সিদ্ধান্ত জানালেন পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী ফুটবলার। এর মধ্য দিয়ে পর্তুগিজ ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে একটি আবেগঘন ভিডিও প্রকাশ করে জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত জানান রোনালদো। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির পর পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

ভিডিওতে রোনালদো বলেন, ‘জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।’

পর্তুগালের জার্সিতে দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিচারণা করে এই মহাতারকা জানান, ২৩ বছর ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাওয়া তার জন্য যেমন গর্বের, তেমনি ছিল বড় দায়িত্বের। ২০০৩ সালের আগস্টে শুরু হওয়া সেই যাত্রা তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে। তবে বিদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না। কারণ, এমন কিছু সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়েও নিতে হয়।

রোনালদোর কাছে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অর্থ শুধু ম্যাচ, গোল কিংবা শিরোপা নয়। দেশের হয়ে খেলার সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পর্তুগিজদের ভালোবাসাও তার কাছে বিশেষ কিছু। বিদেশে বসবাস করা অসংখ্য পর্তুগিজ সমর্থক জাতীয় দলের খেলা দেখতে গিয়ে নিজেদের দেশের আরও কাছাকাছি অনুভব করেছেন। সেই মানুষগুলোর কথাও স্মরণ করেছেন তিনি।

রোনালদোর অবসরের ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন নভেম্বরের আন্তর্জাতিক বিরতির জন্য পর্তুগালের দল ঘোষণার প্রস্তুতি চলছে। উয়েফা নেশন্স লিগে আগামী ১৪ নভেম্বর ডেনমার্ক এবং ১৭ নভেম্বর ওয়েলসের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা পর্তুগালের।

এর আগে জেসুসের প্রাথমিক দলে রোনালদোর নাম থাকার খবর প্রকাশ করেছিল স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হওয়ায় তার ফেরার পথও খোলা ছিল। তবে অবসরের ঘোষণার পর সেই দুই ম্যাচের কোনো একটিতে তিনি খেলবেন কি না, কিংবা বিদায়ী ম্যাচের আয়োজন করা হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় দলের কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে রোনালদোর বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। নরওয়ের বিপক্ষে নেশন্স লিগের ম্যাচে পুরো সময় বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল পর্তুগিজ অধিনায়ককে। দ্বিতীয়ার্ধে দীর্ঘ সময় ওয়ার্মআপ করলেও তাকে মাঠে নামাননি জেসুস। সেই ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছিলেন রোনালদো।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ডেনমার্কের বিপক্ষে পরবর্তী ম্যাচের আগে। সেই ম্যাচেও রোনালদোকে শুরুর একাদশে না রাখার সিদ্ধান্ত জানান জেসুস। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর কোপেনহেগেনে জাতীয় দলের অনুশীলন শিবির ছেড়ে চলে যান পর্তুগিজ তারকা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানালেও জাতীয় দল থেকে স্থায়ীভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি রোনালদো। বরং ৬ অক্টোবর প্রকাশিত দীর্ঘ বিবৃতিতে কোচের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন তিনি।

রোনালদোর দাবি ছিল, জাতীয় দলের হয়ে তার খেলার সময় এবং শারীরিক সক্ষমতা ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেসুসের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু কোচ সেই সমঝোতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেননি। এমনকি ব্যক্তিগত আলোচনায় দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে জেসুসের বক্তব্যের মিল ছিল না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তবে জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল, সেটিও স্বীকার করেছিলেন রোনালদো। সতীর্থ ও পর্তুগিজ সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি নিজের জন্য কোনো বিশেষ ছাড় না দিয়ে শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

সেই ঘটনার পর রোনালদোকে ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। পাশাপাশি ২৫৫ ইউরো জরিমানাও করা হয় তাঁকে। গত ১৯ অক্টোবর এই শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হলেও ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

কোচ জেসুসও রোনালদোর জন্য জাতীয় দলের দরজা খোলা রাখার কথা জানিয়েছিলেন। ফেডারেশন সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েন্সাও তারকা ফুটবলারকে দলে ফেরানোর ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থান প্রকাশ করেন।

এমনকি গত ৬ অক্টোবর নিজের দীর্ঘ বিবৃতিতে রোনালদোও জানিয়েছিলেন, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে এবং ক্লাবের হয়ে নিয়মিত খেলতে পারলে আবারও জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতে চান তিনি। শুধু আনুষ্ঠানিক বিদায়ী ম্যাচ নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ফুটবলে পর্তুগালের হয়ে অবদান রাখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন।

তবে এক মাসের ব্যবধানে সেই অবস্থান বদলে গেল। জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার মধ্যেই অবসরের সিদ্ধান্ত জানালেন পর্তুগিজ মহাতারকা। যদিও কোচের সঙ্গে বিরোধই তার সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০০৩ সালের ২০ আগস্ট কাজাখস্তানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে পর্তুগাল জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের জার্সিতে প্রথমবার মাঠে নেমেছিলেন তিনি। এরপর দুই দশকের বেশি সময় ধরে পর্তুগিজ ফুটবলের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন এই ফরোয়ার্ড।

এখন পর্যন্ত পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো। আন্তর্জাতিক পুরুষ ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ও সর্বোচ্চ গোল করার দুটি বিশ্বরেকর্ডই তাঁর দখলে। জাতীয় দলের হয়ে ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করা প্রথম ইউরোপীয় ফুটবলারও তিনি।

দেশের হয়ে রোনালদোর সবচেয়ে বড় অর্জন ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। ফ্রান্সকে হারিয়ে সেবার প্রথমবারের মতো ইউরোর শিরোপা জিতেছিল পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও জেতেন তিনি।

বিশ্বকাপে অবশ্য অধরা থেকে গেছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটি। রেকর্ড ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও পর্তুগালকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করতে পারেননি রোনালদো। চলতি বছরের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নেয় পর্তুগাল। গত ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের পরই রোনালদো নিশ্চিত করেছিলেন, এটিই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।

তবে তখনই আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়তে চাননি তিনি। আরও কিছুদিন জাতীয় দলের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় জেসুসের অধীনে নতুন নেশন্স লিগ অভিযানেও অংশ নেন। কিন্তু কোচের সঙ্গে বিরোধের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

এদিকে জাতীয় দল থেকে বিদায়ের সিদ্ধান্ত জানালেও ক্লাব ফুটবলে রোনালদোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন কোনো ঘোষণা আসেনি। বর্তমানে সৌদি আরবের আল নাসরের হয়ে খেলছেন তিনি। ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার লক্ষ্যও এখনো সামনে রয়েছে তাঁর।

রোনালদোর বিদায়ের ঘোষণা পর্তুগিজ ফুটবলের জন্য এক যুগের অবসানের বার্তা। তাঁর নেতৃত্বে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছিল দেশটি। বিশ্ব ফুটবলে পর্তুগালের পরিচিতি ও সাফল্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর নাম।

এর আগে গত আগস্টে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচও খেলেন তিনি। এবার সেই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন রোনালদো।

দুই মহাতারকার দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। মেসি জাতীয় দলের জার্সি তুলে রেখেছেন আগেই। রোনালদোর বিদায়ের ঘোষণায় এবার পর্তুগিজ ফুটবলেও শুরু হলো সেই অধ্যায়ের শেষের অপেক্ষা।

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
আগের সংবাদ

বিএনপি নেতার ছেলেকে গুলি করে হত্যা

পরের সংবাদ

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস, তৃণমূল থেকে প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ তৈরির প্রত্...

আরও পড়ুন

বিভাগভিত্তিক আরও সংবাদ

বিভিন্ন বিভাগের সাম্প্রতিক ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এক জায়গায় পড়ুন।

অর্থনীতি

সব সংবাদ