একটি শহর কখন বুঝতে পারে যে সে বিপদে আছে? যখন হাসপাতালের করিডোরে রোগীর ভিড় বাড়ে? যখন জরুরি বিভাগে শয্যা পাওয়া যায় না? যখন চিকিৎসকের কণ্ঠে উদ্বেগ শোনা যায়? নাকি যখন সংবাদপত্রের পাতায় মৃত্যুর সংখ্যা আরেকটু বড় হয়ে ওঠে?
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মনে হয়, আমরা শেষেরটিই সবচেয়ে ভালো বুঝি। সংখ্যা বাড়লে আমাদের উদ্বেগ বাড়ে। মৃত্যু বাড়লে সভা বাড়ে। সভা বাড়লে অভিযান বাড়ে। অভিযান বাড়লে মশক নিধনের ছবি আসে। ছবির সঙ্গে আসে কিছু বিবৃতি, কিছু আশ্বাস, কিছু সতর্কবার্তা। তারপর কয়েকদিন পর আমরা আবার অন্য কোনো খবর নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
এরপর ডেঙ্গু ফিরে আসে। প্রতিবছর প্রায় একই গল্প। শুধু মৃত্যুর সংখ্যাটা নতুন। ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ২১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭০ হাজারের বেশি মানুষ।
শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৫ দিনেই মারা গেছেন ১১৫ জন। অর্থাৎ বছরের মোট মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি ঘটেছে মাত্র একটি মাসের ২৫ দিনে। একই সময়ে প্রতিদিনই শত শত নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন।
একটু ভেবে দেখুন, ২১১ কোনো সংখ্যা নয়। ২১১টি পরিবার। ২১১টি অসমাপ্ত জীবন। ২১১টি ঘরে এমন কিছু শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেটি কোনো সরকারি পরিসংখ্যান পূরণ করতে পারবে না।
কিন্তু রাষ্ট্রকে তো সংখ্যা দিয়েই পরিকল্পনা করতে হয়। সত্যি। তবে প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র যদি আগেই জানে কোন সময় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে, কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি, কোন ধরনের পরিবেশে এডিস মশা জন্মায়, তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার পরই কেন আমাদের সবচেয়ে বেশি তৎপর হতে হবে?
ডেঙ্গু তো কোনো আকস্মিক ভূমিকম্প নয়। এটি রাতারাতি আকাশ থেকে নেমে আসে না। বর্ষার পানি জমে। সেই পানি পড়ে থাকে। কোথাও ড্রেন বন্ধ থাকে। কোথাও নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকে। কোথাও পরিত্যক্ত পাত্র পড়ে থাকে। কোথাও ছাদের কোণে জমে থাকা সামান্য পানিই এডিসের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।
অর্থাৎ মশা আমাদের কোনো গোপন জায়গা থেকে আক্রমণ করছে না। সে আমাদের চোখের সামনেই জন্ম নিচ্ছে। তবু তাকে খুঁজে পেতে আমাদের এত সময় লাগে কেন?
সম্ভবত কারণ আমরা সমস্যার উৎসের চেয়ে সমস্যার দৃশ্যমান ফলাফল নিয়ে বেশি ব্যস্ত। রোগী দৃশ্যমান। হাসপাতাল দৃশ্যমান। মৃত্যু দৃশ্যমান। কিন্তু একটি নির্মাণাধীন ভবনের অন্ধকার কোণে জমে থাকা পানি সংবাদ হয় না।
একটি বন্ধ ড্রেন সংবাদ হয় না। একটি ছাদে পড়ে থাকা পুরোনো প্লাস্টিকের পাত্র সংবাদ হয় না। অথচ সেখান থেকেই হয়তো শুরু হচ্ছে পরের দিনের একটি হাসপাতালভর্তি।
আমাদের ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই। আমরা অনেক সময় সমস্যাকে তার জন্মের জায়গায় গিয়ে থামানোর বদলে, সমস্যাটি বড় হওয়ার পর তার সঙ্গে লড়াই করতে পছন্দ করি।
ডেঙ্গু বাড়লে ফগিং হয়। রোগী বাড়লে হাসপাতাল প্রস্তুত হয়। মৃত্যু বাড়লে সভা হয়। সভা শেষে আবার বলা হয়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। এই ‘নিয়ন্ত্রণে আছে’ কথাটির সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিকদের এক ধরনের দীর্ঘ পরিচয় আছে।
কারণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার ঘোষণা আমরা প্রায়ই শুনি, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার দৃশ্যটা অনেক সময় খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখানে কটাক্ষ করার জায়গা আছে, কিন্তু হাসার মতো খুব বেশি কিছু নেই।
কারণ যার সন্তান হাসপাতালে ভর্তি, তার কাছে ফগিংয়ের ছবি কোনো সান্ত্বনা নয়।যে পরিবার রাতভর হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষা করছে, তার কাছে একটি সরকারি বিবৃতি কোনো চিকিৎসা নয়।
যে পরিবার একজন স্বজনকে হারিয়েছে, তার কাছে পরের দিনের নতুন কোনো সংখ্যা অর্থহীন। তাই ডেঙ্গু নিয়ে প্রশ্নটা শুধু ‘কতজন মারা গেলেন’ হওয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন মারা গেলেন? আর তারও আগে প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন আক্রান্ত হলেন? তারও আগে প্রশ্ন, মশাটি কোথায় জন্ম নিল? আর একেবারে শুরুতে প্রশ্ন, সেই জায়গাটি আগে থেকে শনাক্ত করা হয়নি কেন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে শুধু হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখে না। মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, নজরদারি, জনসম্পৃক্ততা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধটা হাসপাতালে গিয়ে শুরু করলে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। হাসপাতাল হলো শেষ প্রান্ত। যুদ্ধটা আসলে শুরু হওয়ার কথা ছিল বাড়ির ছাদে, ড্রেনে, নির্মাণস্থলে, বর্জ্যের স্তূপে, জলাবদ্ধতার জায়গায়, শহরের প্রতিটি সম্ভাব্য প্রজননস্থলে।
এখানে নাগরিকের দায়িত্বও আছে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া, পরিত্যক্ত পাত্র সরিয়ে ফেলা, নিজের পরিবেশের দিকে নজর রাখা জরুরি।
কিন্তু নাগরিক দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে আড়াল করা যাবে না।
একজন নাগরিক তার নিজের বাসার পানি পরিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু পুরো মহল্লার ড্রেন পরিষ্কার করতে পারেন না।
একজন বাড়ির মালিক নিজের ছাদ দেখবেন। কিন্তু পাশের নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্টে জমে থাকা পানি অপসারণের ক্ষমতা তার নেই। একজন মানুষ মশারি টাঙাতে পারেন। কিন্তু একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তিনি একা বদলাতে পারবেন না।
সুতরাং ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক ও রাষ্ট্র, দুই পক্ষেরই দায়িত্ব আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্বের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। তার কাছে প্রতিষ্ঠান আছে, জনবল আছে, বাজেট আছে, তথ্য আছে, আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আছে। তাই তার কাছ থেকে শুধু অভিযান নয়, পরিমাপযোগ্য ফলাফলও প্রত্যাশিত।
মশক নিয়ন্ত্রণে কত টাকা খরচ হলো, কতবার অভিযান হলো, কত লিটার ওষুধ ছিটানো হলো, কতটি সভা হলো, এসব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই: এর ফলে মানুষ কতটা নিরাপদ হলো? কারণ ফগিং মেশিনের ধোঁয়া যতই ঘন হোক, যদি এডিসের প্রজননস্থল থেকে যায়, তাহলে সেই ধোঁয়া হয়তো কিছুক্ষণ শহরকে দৃশ্যমানভাবে ব্যস্ত রাখবে, কিন্তু সমস্যার শিকড় উপড়ে ফেলবে না।
আর এখানেই সেপ্টেম্বর আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিচ্ছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৫ দিনেই যদি ১১৫ জনের মৃত্যু হয়, তাহলে আমাদের সামনে শুধু আজকের হিসাব নেই। সামনে অক্টোবর আছে, নভেম্বর আছে। সামনে পরের বছরও আছে।
প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবার একই পথে হাঁটব? আবার বর্ষা আসবে। আবার পানি জমবে। আবার মশা বাড়বে। আবার হাসপাতালের বিছানা পূর্ণ হবে। আবার মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ হবে। আবার বলা হবে, অভিযান চলছে। আবার আমরা কয়েকটি ছবি দেখব। আবার কিছুদিন আলোচনা করব। তারপর?
আমরা কি সত্যিই ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, নাকি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের দৃশ্যটি দেখাতে চাই? কারণ একটি রাষ্ট্রের সফলতা কতজন রোগী হাসপাতালে গেলেন, শুধু তা দিয়ে মাপা যায় না। সফলতা অনেক সময় সেখানে, যেখানে রোগী হাসপাতালে যাওয়ার আগেই বিপদটা থামিয়ে দেওয়া যায়।
সেপ্টেম্বর আমাদের সামনে তাই শুধু মৃত্যুর হিসাব রাখেনি। এটি আমাদের ব্যবস্থাপনার আয়নাও তুলে ধরেছে। এই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই? আরও একটি বড় সংখ্যা?
নাকি এমন একটি দিন, যেদিন ডেঙ্গুর খবরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা হবে কতজন মারা গেলেন নয়, বরং কতজনকে মৃত্যুর আগে রক্ষা করা গেল?
শেষ পর্যন্ত মশা আমাদের শত্রু হতে পারে। কিন্তু মশা প্রতি বছর ফিরে আসবে কি না, সেটা হয়তো পুরোপুরি আমাদের হাতে নেই। কিন্তু একই ভুলের কাছে আমরা প্রতি বছর ফিরে যাব কি না, সেটি কি আমাদের হাতেও নেই?