মূল সংবাদে যান
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

আজকের প্রতিহিংসাই কি আগামী দিনের বাকশালের বীজ?

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
আজকের প্রতিহিংসাই কি আগামী দিনের বাকশালের বীজ?
প্রতিকী ছবি

একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা যায়। একটি রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা যায়। একজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা যায়। মামলা দেওয়া যায়। এমনকি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যক্রমও আইনের মাধ্যমে বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কি এভাবে নিষিদ্ধ করা যায়?

প্রশ্নটি এখানেই। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এখন আর কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা নয়। ২০২৫ সালে সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।

২০২৬ সালে সংসদে সংশ্লিষ্ট আইন অনুমোদনের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তিও আরও শক্ত করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপের পক্ষে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং বিচার প্রক্রিয়ার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।

এই অভিযোগগুলোর বিচার হওয়া দরকার। দায়ীদের বিচারও হওয়া দরকার। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ এর সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তরও গুরুতর অভিযোগের কথা জানিয়েছে।

কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়। বিচার আর প্রতিশোধ কি একই জিনিস?

একটি রাষ্ট্র যখন অপরাধের বিচার করে, তখন সে প্রমাণ, আইন, আদালত ও ব্যক্তিগত দায়ের ভিত্তিতে এগোয়। আর যখন রাজনৈতিক প্রতিশোধ রাষ্ট্রের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন অপরাধীর পরিচয় ধীরে ধীরে অপরাধের প্রমাণকে ছাপিয়ে যায়। তখন ব্যক্তি নয়, পরিচয়টাই অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। দল, মত, প্রতীক, সম্পর্ক, অবস্থান, এমনকি নীরবতাও সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে।

এই জায়গাটিই ভয়ংকর। কারণ আজ যে যুক্তিতে আপনি একজনের রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করছেন, আগামীকাল একই যুক্তি অন্য কেউ আপনার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে।

আজ আপনি বলছেন, ‘ওরা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।’ আগামীকাল আপনার প্রতিপক্ষ বলবে, ‘আপনারাও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক।’

আজ আপনি বলছেন, ‘ওদের রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।’ কাল ক্ষমতার পালাবদলের পর কেউ যদি বলে, ‘আপনাদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ হওয়া প্রয়োজন’, তখন আপনি কোন নৈতিক ও সাংবিধানিক যুক্তি দিয়ে তাকে থামাবেন?

রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই। আপনি যদি প্রতিহিংসার জন্য একটি দরজা খুলে দেন, সেই দরজার চাবি আপনার হাতেই থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বলছে, ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভাষা খুব সহজে বদলায় না। এক সময় যে কৌশল এক পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে, অন্য সময় সেটিই অন্য পক্ষের হাতে আরও ভয়ংকর অস্ত্র হয়ে ফিরে এসেছে।

মব তৈরি করা, ঘরবাড়িতে হামলা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল, ক্লাব-সংঘের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবের আওতায় নিয়ে আসা, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বাধা, প্রতিহিংসামূলক মামলা, নির্বিচার গ্রেপ্তার, ঘাট-মাঠ-স্ট্যান্ড দখল কিংবা প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা, এগুলোর কোনোটিই গণতন্ত্রের ভাষা নয়।

কোনো দল করুক, কোনো মতের মানুষ করুক, কোনো সরকারের সময়ে ঘটুক, এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রশ্নে দলীয় পরিচয়ের কোনো মূল্য থাকা উচিত নয়।

কারণ মবের হাতে যখন আইন উঠে যায়, তখন সে প্রথমে আপনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করবে, পরে আপনার দরজায়ও পৌঁছাতে পারে।

আজ যে বাড়িতে আগুন দেওয়া হলো, কাল সেই আগুন অন্য বাড়িতে যাবে। আজ যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল হলো, কাল অন্য কেউ এসে আপনার প্রতিষ্ঠান দখল করবে।

আজ যে রাজনৈতিক সভা বন্ধ করা হলো, কাল আপনার সভার মাইকও বন্ধ হতে পারে। আজ যে মামলাকে ‘ন্যায়বিচারের অংশ’ বলে উদযাপন করা হচ্ছে, কাল একই ধরনের মামলা আপনার বিরুদ্ধে হলে তখন কি সেটিকে প্রতিহিংসা বলা হবে?

এই দ্বৈত নৈতিকতাই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি।আর এখানেই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে।

কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে নিষিদ্ধ করা মানেই তার সামাজিক অস্তিত্ব মুছে ফেলা নয়। রাজনৈতিক দল কেবল অফিস, প্রতীক কিংবা নিবন্ধনের নাম নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে লাখ লাখ মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়, ইতিহাস, স্মৃতি, সম্পর্ক ও স্বার্থ।

তাই একটি দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করার পরও তার সমর্থক ও নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক অবস্থান যে কোনো না কোনোভাবে সমাজে থেকে যেতে পারে।

বর্তমান সরকারের একজন উপদেষ্টাও ২০২৬ সালের জুনে বলেছেন, আওয়ামী লীগের সদস্যরা নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিতে পারেন।

অর্থাৎ প্রশ্নটি কেবল আওয়ামী লীগ থাকবে কি থাকবে না, এত সরল নয়। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের রাজনীতি ভবিষ্যতে কোন সংস্কৃতিতে দাঁড়াবে?

একটি দলকে সরিয়ে আরেকটি দল একই রাজনৈতিক আচরণ করবে? নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির জায়গায় নতুন একটি রাজনৈতিক নৈতিকতা তৈরি হবে?

কারণ যদি পুরোনো সমস্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আমরা পুরোনো পদ্ধতিকেই নতুন পোশাকে ব্যবহার করি, তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়?

শুধু পতাকা বদলাবে। মুখ বদলাবে। স্লোগান বদলাবে। কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলাবে না। তখন ‘নতুন বাংলাদেশ’ আসলে পুরোনো বাংলাদেশেরই নতুন সংস্করণ হয়ে দাঁড়াবে।

সবচেয়ে ভয়ংকর আশঙ্কা আরও এক ধাপ সামনে। আজ যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে আগামী দিনের কোনো ক্ষমতাসীন শক্তি একই যুক্তি ব্যবহার করে আরও বড় দমন-পীড়নের পথ তৈরি করতে পারে।

আজকের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যদি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এমন একটি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামো রেখে যায়, যেখানে বিরোধী মতকে নিষিদ্ধ করা, মামলা দিয়ে চেপে রাখা, সভা বন্ধ করা কিংবা সামাজিকভাবে কোণঠাসা করা সহজ হয়ে যায়, তাহলে সেই কাঠামো একদিন কার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে, সেটি কেউ জানে না।

এ কারণেই আজকের প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভবিষ্যতের একটি প্রশ্ন জুড়ে দেওয়া জরুরি: ‘এই একই ক্ষমতা যদি আগামীকাল আমার প্রতিপক্ষের হাতে যায়, তখনও কি আমি এই সিদ্ধান্তকে ন্যায়সঙ্গত বলব?’ যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আজই থামতে হবে।

কারণ রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সরকারও কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্থায়ী মালিকানা নয়। ক্ষমতা একটি সাময়িক দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাব বহু প্রজন্ম ধরে থাকে।

আর সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। আমরা যদি আজ প্রতিহিংসাকে ন্যায়বিচার বলে প্রতিষ্ঠা করি, আগামীকাল প্রতিহিংসাই ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা লিখবে।

আমরা যদি আজ মবকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে বৈধতা দিই, আগামীকাল মবই রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে।

আমরা যদি আজ দখলকে ক্ষমতার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ বানাই, আগামীকাল ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে শুধু দখলদারের নাম বদলাবে।

আমরা যদি আজ বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে দেখতে শিখি, আগামীকাল গণতন্ত্রে বিরোধিতা করার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।

আর তখন হয়তো সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হবে এই যে, আমরা একটি পুরোনো কর্তৃত্ববাদকে পরাজিত করতে গিয়ে কর্তৃত্ববাদেরই নতুন ব্যাকরণ লিখে ফেলেছি।

তখন কেউ হয়তো নতুন মোড়কের কোনো একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। নামটি বাকশাল নাও হতে পারে। পতাকা অন্য রঙের হতে পারে। স্লোগানও ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু যদি রাষ্ট্রের ভেতরে প্রশ্নহীন ক্ষমতা, বিরোধী মত দমন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং প্রতিষ্ঠান দখলের একই সংস্কৃতি ফিরে আসে, তাহলে মোড়ক বদলালেও চরিত্র বদলাবে না।

সুতরাং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে, বিএনপির ভবিষ্যৎ কী হবে, নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসবে কি না, এসব প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো:

বাংলাদেশের রাজনীতি কি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বের হতে পারবে? কারণ ক্ষমতার পালাবদল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু প্রতিহিংসার পালাবদল গণতন্ত্র নয়।

আজ যদি এক পক্ষের ওপর অন্য পক্ষের প্রতিশোধকে আমরা হাততালি দিয়ে স্বাগত জানাই, তাহলে আগামী দিনের প্রতিশোধের জন্যও আমরা নিজেরাই মঞ্চ প্রস্তুত করছি।

আর ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ব্যঙ্গ হলো, প্রতিশোধের রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত কেউ বিজয়ী হয় না। শুধু প্রতিশোধের পরবর্তী শিকারটি বদলে যায়।

তাই আজকের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক অবস্থান আওয়ামী লীগপন্থী, বিএনপিপন্থী, জামায়াতপন্থী, এনসিপিপন্থী কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের হওয়া নয়।

সবচেয়ে জরুরি অবস্থান হলো অন্যায় যে পক্ষই করুক, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কারণ রাষ্ট্রকে দলীয় প্রতিশোধের হাত থেকে বাঁচাতে না পারলে কোনো দলই শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে না।

আজ যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে, তাদের জন্যও প্রশ্নটি রেখে যাওয়া দরকার: আপনারা কি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করছেন, যেখানে আগামী দিনের ক্ষমতাসীনরা আপনাদের উত্তরসূরি হবে, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছেন যেখানে একদিন আপনাদেরই তৈরি করা অস্ত্র আপনাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে?

ইতিহাস উত্তর দেবে। কিন্তু তার আগে সিদ্ধান্তটা আমাদেরই।

লেখক: কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী

বিজ্ঞাপন বিজ্ঞাপনের স্থান
আগের সংবাদ

ব্যাংক থেকে ৬ লাখ টাকা উত্তোলন, বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাই

পরের সংবাদ

মৃত্যুর পর জাগে যে শহর: একই মশা, একই মৃত্যু, একই উদাসীনতা

আরও পড়ুন

বিভাগভিত্তিক আরও সংবাদ

বিভিন্ন বিভাগের সাম্প্রতিক ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এক জায়গায় পড়ুন।