প্লট সংকট, জলাবদ্ধতা, জরাজীর্ণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যায় যশোর বিসিক শিল্পনগরীর উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
নতুন উদ্যোক্তাদের চাহিদা থাকলেও খালি প্লট না থাকায় শিল্প স্থাপনের সুযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, প্রায় দেড় দশকেও বাস্তবায়িত হয়নি দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের উদ্যোগ।
যশোর শহর সংলগ্ন যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুরে ১৯৬২ সালে ৫০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে বিসিক শিল্পনগরী। বিসিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে ১২২টি শিল্প ইউনিট চালু রয়েছে।
এসব কারখানায় হালকা প্রকৌশল, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, কৃষি যন্ত্রপাতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক ও কেমিক্যালসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয়। বছরে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। কর্মসংস্থান হয়েছে ৬ হাজার ৯১৮ জনের, যাদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৮৬ জন নারী।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় শিল্পনগরীর অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। সড়কে গর্ত, অকার্যকর ড্রেন এবং বৃষ্টিতে কারখানার ভেতরে পানি ঢুকে পড়ায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। নিয়মিত সার্ভিস চার্জ দিলেও প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তারা।
এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন বলেন, ১৯৬২ সালে ২৫টি ইউনিটের জন্য স্থাপিত পানির পাম্পের পুরোনো ব্যবস্থার ওপর এখন ১২২টি ইউনিটকে নির্ভর করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পানি সরবরাহ স্বাভাবিক নয়। আগুন লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত পানির উৎস না থাকার কথাও জানান তিনি।
আকতার হোসেনের অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্কারের অভাবে চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। রাতে সড়কবাতি ও স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প না থাকায় শ্রমিকদের, বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমইউ সিইএ ফুডসের স্বত্বাধিকারী শ্যামল দাস বলেন, শিল্পনগরীতে সীমানা প্রাচীর, প্রধান ফটক ও নিজস্ব বৈদ্যুতিক ফিডার নেই।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক ও ছয় কিলোমিটার ড্রেনের বড় অংশ দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
বিসিক সূত্র জানায়, উদ্যোক্তাদের চাহিদা বিবেচনায় ২০১১ সালের ৮ মে দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়। প্রথমে যশোর-নড়াইল সড়কের ফতেপুর এলাকায় ৪০ একর সরকারি জমিতে অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব ছিল।
পরে সদর উপজেলার রামনগরে ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
যশোর শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ উৎপাদন, বাস-ট্রাকের বডি তৈরি, তিন চাকার যান সংযোজন ও মেরামতের বহু কারখানা রয়েছে।
বিসিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা সম্প্রসারণে প্লট চেয়ে আবেদন করলেও জায়গার অভাবে তাদের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক তানভিরুল ইসলাম সোহান বলেন, অবকাঠামোগত দুর্বলতায় নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বিদ্যমান বিসিকের আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রস্তাবিত শিল্প পার্ক দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
চেম্বারের সভাপতি মিজানুর রহমান খান শিল্পের উৎপাদন ও সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ বিষয়ে যশোর বিসিকের জেলা কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এম এনাম আহমেদ বলেন, বিসিক শিল্পনগরীগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানে সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
যশোরের বিদ্যমান বিসিক আধুনিকায়নের পাশাপাশি রামনগরে প্রস্তাবিত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক স্থাপনের উদ্যোগও বেগবান করা হচ্ছে।
তিনি জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিকল্প ড্রেনেজ ব্যবস্থার খসড়া প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। নতুন শিল্প পার্ক বাস্তবায়িত হলে কয়েক হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং প্লট সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।