যশোরের মনিরামপুর উপজেলার শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামে পুকুরের ওপর নড়বড়ে কাঠের একটি দোকানঘর। হেলে পড়া সেই ঘরটিই ৯০ বছর বয়সী অসুস্থ বৃদ্ধা নবীরুন্নেসার একমাত্র আশ্রয়। নেই বিছানা, বালিশ কিংবা নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা। কখন ভেঙে পুকুরে পড়ে যায়—এই শঙ্কার মধ্যেই বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে তার জীবন।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ নবীরুন্নেসা দিনের আলোতেও স্পষ্ট দেখতে পান না। সন্ধ্যা নামলেই প্রায় পুরোপুরি দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন। ফলে একা কোথাও যেতে পারেন না। কেউ খাবার দিলে খান, না দিলে অনেক সময় না খেয়েই রাত কাটাতে হয়।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আগরহাটি গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে বৃদ্ধার জীবনের এমন করুণ চিত্র দেখা যায়। পুকুরের এক কোণে বাঁশ ও কাঠের খুঁটির ওপর কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে নড়বড়ে দোকানঘরটি। সামনের অংশ অনেকটাই হেলে পড়েছে। যেকোনো সময় কাঠামোটি ভেঙে পুকুরে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘরটির ভেতরে নেই কোনো বিছানা বা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। কয়েকটি প্যাকেট ও সামান্য কিছু জিনিসপত্রই তার সম্বল। ঘরের এক পাশে কয়েকটি প্লাস্টিকের জারে রাখা রয়েছে মুড়ি। সেটিই অনেক সময় তার খাবারের ভরসা।
বৃদ্ধা নবীরুন্নেসা জানান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তার স্বামী হবিবুর রহমান নিখোঁজ হন। কোথায় এবং কীভাবে তিনি মারা গেছেন, সে বিষয়ে আজও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি তিনি। দীর্ঘদিন স্বামীর খোঁজ করেও সন্ধান না পেয়ে দুই মেয়েকে নিয়ে বেনাপোলের বারোপোঁতা এলাকা থেকে বাবার বাড়ি মনিরামপুরের শ্যামকুড় ইউনিয়নের আগরহাটি গ্রামে ফিরে আসেন।
বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া সামান্য সম্পদ দিয়ে দুই মেয়ের বিয়ে দেন। মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে নিজের সহায়-সম্বলও হারিয়ে ফেলেন। এরপর থেকেই অভাব-অনটনের মধ্যে তার জীবন কাটতে থাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২০ থেকে ২২ বছর আগে এক ভাইপো তাকে একটি পরিত্যক্ত কাঠের দোকানঘর এনে দেন। বসতভিটার নিজস্ব জায়গা না থাকায় আগরহাটি গ্রামের একাধিক মালিকানাধীন একটি বড় পুকুরের এক কোণে তাকে থাকার জায়গা দেওয়া হয়। এর আগে তিনি ভাই ও ভাইপোদের বাড়িতে রাত কাটাতেন।
নবীরুন্নেসার দুই মেয়ের মধ্যে একজন প্রায় ২০ বছর আগে শ্বশুরবাড়িতে যৌতুকজনিত চাপ ও দারিদ্র্যের কারণে আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করেন তিনি। অপর মেয়ের সংসারেও আর্থিক সংকট রয়েছে।
বৃদ্ধা বলেন, চোখে দেখতে না পাওয়ায় তার কষ্ট আরও বেড়েছে। স্থানীয় কয়েকটি পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে খাবার দিয়ে সহযোগিতা করে। কিন্তু যেদিন কেউ খাবার দিতে ভুলে যান, সেদিন না খেয়েই থাকতে হয়।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে নবীরুন্নেসা বলেন, “আমি খাব কী, থাকব কোথায়? দোকানটা ওরা দিয়েছিল বলে এতদিন বেঁচে আছি। এখন সেটাও ভেঙে পড়ছে। আমি কোথায় থাকব?”
তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়া। তিনি বলেন, চোখে দেখতে পারলে কারও বোঝা হয়ে থাকতে হতো না। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে হলেও নিজের খাবারের ব্যবস্থা করতে পারতেন।
স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপির নেতা ও সম্ভাব্য ইউপি সদস্য প্রার্থী মামুনুর রশীদ মিন্টু বলেন, নবীরুন্নেসা তার ফুফু। সামর্থ্য অনুযায়ী তারা সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। তবে সরকারি সহায়তা ছাড়া তার স্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখলে বৃদ্ধা জীবনের শেষ সময়ে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৃদ্ধার এই জীবনযাপন স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। জীবনের শেষ সময়ে যেখানে একজন মানুষের নিরাপদ আশ্রয় ও পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়ার কথা, সেখানে পুকুরের ওপর নড়বড়ে কাঠের ঘরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নবীরুন্নেসা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে বৃদ্ধার জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি তার চোখের চিকিৎসা ও নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা হলে জীবনের শেষ দিনগুলো কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারবেন তিনি।